মানিক মিয়া ছিলেন বঙ্গবন্ধুর শ্রদ্ধার পাত্র

(ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ এর কলাম)

বঙ্গবন্ধু ও দৈনিক ইত্তেফাক একই সূত্রে গাঁথা। দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী, সাংবাদিকতার লিজেন্ড তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন বঙ্গবন্ধুর শ্রদ্ধার পাত্র। এসব কারণেই দেশের বহু মানুষ এখনো ইত্তেফাককে নিজের পত্রিকা মনে করে, স্বাধীনতাসংগ্রামের মুখপত্র মনে করে। যদিও একসময় পত্রিকাটি তাই ছিল। এসব কারণেই ইত্তেফাকের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর কিছু উদ্যোগের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছেন সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে। দীর্ঘ সাড়ে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এমন একটি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন যা ছিল যুদ্ধ বিধ্বস্ত এবং সার্বিকভাবে বিপন্ন প্রায় অর্থনীতি সংবলিত একটি দেশ। রাস্তাঘাট ছিল না, ব্রিজ-কালভার্ট ছিল না। যোগাযোগব্যবস্থা ছিল প্রায় সম্পূর্ণরূপেই বিধ্বস্ত। এমনকি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি ব্যবস্থাও স্হবির হয়ে ছিল। শিল্প-কারখানা বন্ধ ছিল। উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় থেকেই। প্রশাসনিক ব্যবস্থাও একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী ছিল না। এমনকি দেশে কোনো সংবিধানও ছিল না। বিদেশের স্বীকৃতিও তেমন একটা ছিল না। এমনই এক অবস্থায় বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যে কোনো নেতার পক্ষে এই অবস্থায় বিহ্বল হয়ে পড়ার কথা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তো বঙ্গবন্ধুই। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মনোনিবেশ করেন। অবশ্য বঙ্গবন্ধু আগে থেকেই জানতেন তাকে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা শোচনীয় ছিল। কারণ পাকিস্তানিরা আমাদের শাসন-শোষণ করছিল। ফলে এই অঞ্চলের উন্নয়ন সাংঘাতিকভাবে বিঘ্নিত হয়। অখণ্ড পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনীতিতে আমাদের এই অঞ্চলের অবদান বেশি ছিল। কিন্তু ১৯৭০ সালে পর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে আয় বেশি হয়ে যায়। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের অবদান ছিল প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর পশ্চিম পাকিস্তানের অবদান ছিল প্রায় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনীতিতে পশ্চিম পাকিস্তানের অবদান বেড়ে হয় প্রায় সাড়ে ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এটা দাঁড়ায় সাড়ে ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাকিস্তানের অর্থনীতিতে পশ্চিম পাকিস্তানের অবদান দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। আর আমাদের এই অঞ্চলের অবদান বৃদ্ধি পায় ৫০ শতাংশের মতো। এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের এই অঞ্চল অর্থাত্ বাংলাদেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করেন মানুষকে কেন্দ্র করে। প্রথমেই তিনি ভারত থেকে ফিরে আসা ১ কোটি মানুষকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ভারতফেরত এসব মানুষের খাদ্য, আশ্রয় কিছুই ছিল না। এমনকি যারা দেশের অভ্যন্তরে ছিলেন তাদেরও অবস্থাও ছিল বিধ্বস্ত প্রায়। তিনি প্রথমেই এসব বিপন্নপ্রায় মানুষের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করেন। বিষয়টি আমি ভালোভাবে জানি। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম দুই মাস আমি ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলাম। কাজেই খুব ঘনিষ্ঠভাবে ত্রাণকার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমি নিজেও বিভিন্ন স্হানে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম দেখতে যেতাম। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষ যাতে আবারও উঠে দাঁড়াতে পারে।

একটি দেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নে অবকাঠামো খাতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কোনোভাবেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন না করে সার্বিকভাবে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধু বিষয়টি অত্যন্ত ভালোভাবে অনুধাবন করেছিলেন। তাই তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দেশের বিধ্বস্তপ্রায় অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগ দেন। গ্রামের রাস্তাঘাট ছিল বিধ্বস্ত প্রায়। শহরের সঙ্গে গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো ছিল না। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করা হয়। বিধ্বস্ত প্রায় রাস্তাঘাট পুনর্নির্মাণ করা হয়। অনেকগুলো নতুন রাস্তা নির্মিত হয়। ফলে মোটামুটি চলাচলের ব্যবস্থা অনেকটাই উন্নত হয়। ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার যেতে অনেকগুলো ফেরি ছিল। এগুলো পেরিয়ে ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার যেতে প্রায় দেড় দিন লেগে যেত। অল্প দিনের মধ্যেই ঢাকা-মৌলভীবাজার সড়ক যোগাযোগ উন্নত হয়ে যায়।

বাংলাদেশ মূলক একটি কৃষি প্রধান দেশ। জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু মাটি ও মানুষের রাজনীতিবিদ হিসেবে এটা ভালো করেই জানতেন যে, কৃষির উন্নয়ন ঘটানো না গেলে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না। তাই তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর কৃষির উন্নয়ন ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেন। কৃষি উন্নয়নে তিনি যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করেন তা ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী এবং সময়োপযোগী। বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি জুড়ে ছিল দেশের কৃষি ও কৃষক। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাবার পরই বঙ্গবন্ধু কৃষকদের মামলার জট থেকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পাকিস্তান আমলে কৃষকের বিরুদ্ধে ব্যাংকগুলো ১০ লাখ মামলা দায়ের করেছিল। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই সেই সব সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করেন। তিনি গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জন্য টেস্ট রিলিফের টাকা দিলেন। কৃষকদের জন্য ঋণদানের ব্যবস্থা করা হলো। সমবায় ঋণদানের ব্যবস্থা করা হলো। এসব ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষক যাতে আবারও পূর্ণোদ্যমে কৃষি কাজ শুরু করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা। কৃষকদের বীজ-সার এবং কৃষি যন্ত্রপাতি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। এমনকি সেচের জন্য বাইরে থেকে কিছু যন্ত্রপাতি আনার ব্যবস্থা করা হলো। কৃষির উন্নয়নে কী করতে হবে সেটা বঙ্গবন্ধু ভালোভাবেই জানতেন। শেষের দিকে এসে তিনি যেটা করলেন তা হলো—সমবায় ব্যবস্থার প্রবর্তন। প্রত্যেক গ্রামে একটি করে সমবায় সমিতি গঠিত হবে। এটা ছিল বাকশালের কনসেপ্ট। গ্রামে যে কৃষি কার্যক্রম পরিচালনা হবে বা শিল্প-কারখানা স্হাপিত হবে তা হবে এই সমবায় সমিতির আওতায়। গ্রামের সবাই উৎপাদন এবং বিপণন কাজে অংশ গ্রহণের সুযোগ পাবে। কারো জমি বা সম্পদ কেড়ে নেওয়া হবে না। কিন্তু উৎপাদন কার্যক্রমের সুফল সাবাই ন্যাঘ্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারবে—এটাই ছিল সমবায় ব্যবস্থার মূলমন্ত্র। যাদের জমি আছে তারা জমির মালিকানার বিপরীতে উৎপাদনের অংশ পাবেন। যারা শ্রম দেবে তারা তাদের শ্রমের মূল্য পাবেন। আর সমবায় সমিতি উৎপাদনের একটি অংশ পাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সমবায়ের মাধ্যমে যে উৎপাদন হবে তার একটি অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। চীন এবং রাশিয়ার উৎপাদন পদ্ধতির প্রতি বঙ্গবন্ধুর খুব অগ্রহ ছিল, কিন্তু তিনি ঐসব দেশের উৎপাদন পদ্ধতি হুবহু অনুসরণ করার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি এ ক্ষেত্রে নিজস্ব একটি ব্যবস্থা উদ্ভাবন করতে চেয়েছিলেন। চীন বা রাশিয়ায় সমবায় পদ্ধতির মাধ্যমে রাষ্ট্র সব জমি বা সম্পদের মালিকানা নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যে সমবায় পদ্ধতির কথা চিন্তা সেখানে কারো জমির মালিকানা হারানোর আশঙ্কা ছিল না। সমবায় পদ্ধতিতে চাষাবাদের মাধ্যমে প্রতি খণ্ড জমি আবাদের আওতায় নিয়ে আসার ইচ্ছে ছিল বঙ্গবন্ধুর। এমনকি এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হলে জমির ‘আইল’ তুলে দেওয়া হতো। এতে বিপুল পরিমাণ জমি চাষাবাদের আওতায় চলে আসত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এই সমবায় ব্যবস্থা প্রবর্তন করে যেতে পারেননি। এমনকি তিনি সমবায় ফান্ড গঠনের কথাও চিন্তা করেছিলেন। সমবায় সমিতির মাধ্যমে যে আয় হবে তার একটি অংশ এই ফান্ডে জমা হবে এবং সরকারও একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বাজেট থেকে এই ফান্ডে দেবে। ফান্ডের অর্থ কৃষি উন্নয়নে কাজে লাগানো হবে। সমবায় ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে সব পক্ষই উপকৃত হতো।

বঙ্গবন্ধু বৃহত্ শিল্প-কারখানাগুলো রাষ্ট্রীয়করণ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল কেউ যাতে সাধারণ মানুষকে শোষণ করে বেশি ধনী হতে না পারে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে এ ধরনের একটি অঙ্গীকার ছিল। দেশে অবশ্যই বড় শিল্প-কারখানা স্হাপিত হবে। কিন্তু সেই শিল্পের মালিকানা কোনো ব্যক্তি বিশেষের হাতে থাকবে না। শিল্পের মালিকানা থাকবে রাষ্ট্রের হাতে। যে উৎপাদন হবে তার সুবিধা সবাই ভোগ করতে পারবে। সব শিল্প কিন্তু রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়নি। পাট, চিনি এবং অন্য একটি খাতকে পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসা হয়েছিল। শিল্প-কারখানা রাষ্ট্রীয়করণে নীতি হঠাত্ করেই গৃহীত হয়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনি ইশতেহারেই এটা বর্ণিত হয়েছিল। ব্যক্তিগত মালিকানায় ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে উৎসাহিত করা হয়েছে অধিকতর কর্মসংস্হানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য। বঙ্গবন্ধু চাইতেন কৃষি এবং শিল্প খাতে যেন অধিক মানুষ সম্পৃক্ত হতে পারে। এতে কর্মসংস্হানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। জাতীয় অর্থনীতি স্হিতিশীল হবে।

কৃষি খাতে বঙ্গবন্ধু সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা মওকুফ করে দেওয়া। এবং পরিবারপ্রতি জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সিলিং ১০০ বিঘা নির্ধারণ করে দেওয়া। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষি জমি যাতে সামান্য কিছু পরিবারের হাতে পুঞ্জীভূত না হয়।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বহুমুখী আলোচনা হচ্ছে। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে তিনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনায়নের গুরত্বের কথা বলেছিলেন। এমনকি বঙ্গবন্ধু উপকূলীয় বনায়নের কথাও বলেছিলেন। উপকূলীয় বনায়নের বিষয়টি তখনো ছিল অনেকটাই মানুষের জানার বাইরে।

বঙ্গবন্ধু দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন বর্তমান সরকার তার সূত্র ধরে দেশকে ইতিমধ্যেই খাদ্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করে ফেলেছে। বর্তমান সরকার হচ্ছে কৃষিবান্ধব সরকার। সরকারি পরিকল্পনায় কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে দেশের মানুষের সংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। বর্তমানে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৭০ লাখে উন্নীত হয়েছে। সেই সময় দেশে বার্ষিক খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টন, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে তা ৪ কোটি ১৩ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। পরবর্তী তিন বছরে তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ বাড়িঘর নির্মাণ, রাস্তা তৈরি, কলকারখানা স্হাপন ইত্যাদি কারণে জমির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমেছে। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সারের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমানো হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকায়ন ইতিমধ্যেই ব্যাপক ভাবে শুরু হয়েছে। আমাদের নিশ্চয়ই মনে থাকার কথা। উন্নয়ন সহযোগীদের প্রচণ্ড আপত্তি উপেক্ষা করে কৃষি খাতে বিপুল পরিমাণ ভতু‌র্কি প্রদান অব্যাহত রাখে। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর দেশের অর্থনীতির গতি অন্য দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কৃষিকে অবহেলা করার হয়। ’৮০ দশকে বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরা পরামর্শ দেয় শিল্প স্হাপনের জন্য। তাদের বক্তব্য হচ্ছে—দেশ শিল্পে সমৃদ্ধ হলে খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি করলেও চলবে। কৃষিকে অবহেলা করা শুরু হয়। ফলে বঙ্গবন্ধুর আমলে কৃষি খাতে যে অগ্রগতি শুরু হয়েছিল বিঘ্নিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে এবং পরবর্তীকালে ২০০৯ সাল থেকে অদ্যাবধি কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য নানা কার্যক্রম গ্রহণ করে চলেছে। এই কার্যক্রম বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা ২০২০ সালেই খাদ্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে সেই উদ্যোগে কিছুটা হলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। করোনার কারণে কৃষকের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। স্বাস্হ্য, শিক্ষা, সামজিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ যথেষ্ট উন্নতি করেছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও এগিয়ে গেছে। স্বাস্হ্য খাতে উন্নতির একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে আমাদের প্রত্যাশিত গড় আয়। বাংলাদেশের প্রত্যাশিত আয়ু এখন ৭৩ বছরের বেশি। শিশু মৃতু্য, মাতৃমৃতু্যর হার কমেছে। করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের দারিদ্রে্যর হার কমেছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। দারিদ্রে্যর হার ২২ শতাংশে নেমে এসেছিল। অতি দারিদ্রে্যর হার ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু করোনার কারণে এটা আবার কিছুটা বেড়েছে। বর্তমান সরকার আমলে নারীদের অর্থায়ন ও ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ নেতৃত্বের আসনে রয়েছে, যদিও আমাদের এ ক্ষেত্রে আরো অনেক দূর যেতে হবে।

বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নতি করতে। বর্তমান সরকারও সেই লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামে পাকা রাস্তা নির্মিত হয়েছে। অধিকাংশ গ্রামে এখন বিদু্যত্ সুবিধা সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে এখনো আরো অনেক কী করণীয় আছে। বর্তমান সরকার শহরের সুবিধা গ্রামে নিয়ে যেতে চায়। গ্রামের মানুষ গ্রামে থেকেই যাতে শহরের সব সুবিধা ভোগ করতে পারেন সেই ব্যবস্থা করা হবে। অনেকই অজ্ঞতাবশত বলে থাকেন, সরকার গ্রামকে শহর বানাতে চান। আসলে তা নয়। সরকার শহরের সুবিধা গ্রামে নিয়ে যেতে চান। অবশ্য এটাও ঠিক যে ইতিমধ্যেই শহরের অনেক সুবিধা গ্রামে পাওয়া যাচ্ছে। গ্রামের চিরাচরিত রূপ অপরিবর্তিত থাকবে। শুধু শহরের সুবিধাগুলো সেখানে সম্প্রসারিত করা হবে।

বর্তমান সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ নিয়েছেন তার প্রায় সবগুলোই পল্লি এলাকায় স্হাপিত হবে। এটা গ্রামীণ উন্নয়নে কতটা অবদান রাখবে বলে মনে করেন?

আমার টেকসই উন্নয়নের কথা বলছি। কৃষির উন্নয়ন আমাদের অনেক হয়েছে। আগামীতেও হবে। এখন শিল্পের প্রতি দৃষ্টি দিতে। সরকার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই করার লক্ষ্যে শিল্পায়নের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। আমাদের দেশে শিল্প স্হাপনের ক্ষেত্রে একটি জটিল সমস্যা হচ্ছে উপযুক্ত জমির প্রাপ্যতা। জাপানি একটি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী কয়েক বছর আগে বড় আকারের বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশে এলেও তারা শিল্প স্হাপনের মতো উপযুক্ত জমি না পেয়ে বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রত্যাহার করে চলে যায়। শিল্প স্হাপনের উপযুক্ত জমির অভাব পূরণ এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সবার জন্য অবারিত করার লক্ষ্যেই সরকার দেশের বিভিন্ন স্হানে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্হাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কৃষি খাত থেকে যে কাঁচমাল আসে তা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অধিকতর উপযোগী করে তোলার জন্য শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া আগামীতে কৃষি যান্ত্রিকায়ন হলে এই খাতের উদ্বৃত্ত শ্রম শক্তির বিকল্প কর্মসংস্হানের ব্যবস্থা করতে হবে। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্হাপিত হলে সেখানে মানুষের কর্মসংস্হানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গ্রামের সাধারণ মানুষের কর্মসংস্হান হবে। প্রতিটি অর্থনৈতিক অঞ্চলই হবে বিশাল আকারের। যদিও সেখানে ছোট-বড় সব ধরনের শিল্প-কারখানাই স্হাপিত হবে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে আশপাশে অনেক ধরনের উদ্যোগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন ঘটবে তাতে অনেক মানুষ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। কিন্তু নারী উদ্যোক্তারা এখনো পিছিয়ে আছে। সরকার তাদের উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, কিন্তু আরো করতে হবে।

লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, পল্লী কর্মসংস্হান ফাইন্ডেশন(পিকেএসএফ), ঢাকা

কাজী খলিকুজ্জামান ১৯৪০ সালে সিলেট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাদ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরিক্ষায় ভালো ফলাফল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে তিনি মেধ‌ি ফিলোশিপ করে লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকস এন্ড পলিটিক্স থেকে অর্থনীতি বিষয়ে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা সেলে কাজ করেন।

 

নিউজ সোর্সঃ

দৈনিক ইত্তেফাক, ২৪ ডিসেম্বর ২০২১, https://www.ittefaq.com.bd/307382/মানিক-মিয়া-ছিলেন-বঙ্গবন্ধুর-শ্রদ্ধার-পাত্র

About the author